সুমন মাহমুদ শেখ(স্টাফ রিপোর্টার)নেত্রকোনা জেলার কৃষ্ণপুর সরকারি হাজী আলী আকবর কলেজের প্রভাষক ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগে ১২ বছর ধরে শিক্ষকতা করার লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষ্ণপুর এলাকার ফয়সাল তালুকদার নামের এক ব্যাক্তি মাউশি ও দুদকসহ সংশ্লিস্ট একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।লিখিত অভিযোগ ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, ইকবাল হোসেন ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার কৃষ্ণপুর সরকারি হাজী আলী আকবর কলেজের ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। যোগদানের সময় তিনি তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেন। কিন্তু কলেজে দাখিলকৃত শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর। ফলাফল প্রকাশের আগেই তিনি নিবন্ধন সনদ জমা দেওয়ায় গত ২০১৫ সালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ইকবাল হোসেনের নিয়োগ সনদ সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন। নিয়োগ সঠিক না থাকার পরেও তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ প্রভাব খাটিয়ে নিয়মিত সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছেন। ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কৃষ্ণপুর এলাকার ফয়সাল তালুকদার নামের এক ব্যাক্তি গত ৮ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এমনকি তিনি মাউশি ও দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর অদ্য ১৮ ই জানুয়ারি এ অবৈধ নিয়োগের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করেন।এর আগেও ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সরকারি হাজী আলী আকবর কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ ছাইফুল ইসলাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রভাষক ইকবাল হোসেনের নিয়োগ অবৈধ উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ করা সত্বেও অভিযোগের প্রেক্ষিতে অদৃশ্য কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নঅভিযোগকারী ফয়সাল তালুকদার জানান, “সরকারি বিধি অনুযায়ী ইকবাল হোসেন জালিয়াতি করে অবৈধভাবে চাকুরী নিয়েছেন। তিনি বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে দলীয় প্রভাব ও প্রভাবশালীদের স্বজন পরিচয়ে কলেজসহ উপজেলায় বিভিন্ন ধরণের অপকর্ম করেছেন।” তার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় এলাকার সচেতন অভিভাবক মহল।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রভাষক ইকবাল হোসেন জানান- "অভিযোগটি সত্য নয়। সনদটি ভুয়া নয়। ২০১৩ সালে এ কলেজটি একটি বেসরকারি কলেজ ছিল৷ আমি অনার্স শিক্ষক হিসেবে নিবন্ধন পরীক্ষার এডমিড কার্ড সংযুক্ত করে আবেদন করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে যথাযথভাবে উত্তীর্ণ (তৃতীয়) হই। রেজাল্ট প্রকাশে ২০দিন বিলম্ব হচ্ছিল বিধায় নিয়োগ কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রথমে শর্তসাপেক্ষে এবং পরবর্তীতে ফলাফল প্রকাশের পর চূড়ান্ত নিয়োগ দেন। বিষয়টি অভিযোগকারী জানলেও সত্য আড়াল করে সামাজিকভাবে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশে এমনটা করছেন।এছাড়া মাউশি'র নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে সংশোধন করেন। একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে কাদা ছুড়াছুঁড়ি করা খুবই ন্যাক্কারজনক ব্যাপার।মূলতঃ পারিবারিক কলহের জেরে তিনি এমনটা করেছে আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশে।”সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা যায়, প্রভাষক ইকবাল হোসেনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তখন কলেজটি বেসরকারি কলেজ ছিল বিধায় নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়োগ কর্তৃপক্ষের আধিপত্য ছিল। নিয়োগ কর্তৃপক্ষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনৈতিকভাবে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। এমতবস্থায় নিয়োগ কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগকৃত শিক্ষক উভয় পক্ষকেই জবাবদিহিতার আওতায় এনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানায় এলাকার সচেতন অভিভাবক মহল।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষ্ণপুর সরকারি হাজী আলী আকবর কলেজের অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম জানান, “ইকবাল হোসেনর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ বারো বছর আগের ঘটনা। ইকবাল হোসেন প্রথমে যে সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিলেন তখন পরিদর্শক কমিটি সেখানে এটির ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ঐ পরিদর্শন কমিটি আবার সঠিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছেন।নিয়োগ হয়েছে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর কিন্তু নিবন্ধনের ফল প্রকাশ হয়েছে একই বছরের ২০ নভেম্বর। সুতরাং স্পষ্টতই এ নিয়োগ অবৈধ। তাহলে বিজ্ঞপ্তিতে নিবন্ধনধারী উল্লেখ থাকলেও কিভাবে সে নিয়োগ প্রাপ্ত হয় এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, “আমি উনার নিয়োগের অনেক পরে এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আসছি। নিয়োগ হয়েছে ১২ বছরে আগে, তখনকার সময়ের বিষয়টা আমি অবগত নই।এ ব্যাপারে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম জানান, “অভিযোগের বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। তদন্ত কমিটি করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।” উল্লেখ্য, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পঞ্চম পাতায় ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের এনটিআরসি’র মন্তব্য কলামে জনাব ইকবাল হোসেন, প্রভাষক, ইংরেজি এর নিবন্ধন সনদ সঠিক নয় মর্মে উল্লেখ করেন। জনাব ইকবাল হোসেন এর নিবন্ধন সনদটি সঠিক না হওয়ায় তার নিয়োগ বৈধ নয়।