চয়ন চৌধুরী ( মধ্যনগর থেকে) ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধে সীমান্ত এলাকায় কোনো কোরবানির হাট ইজারা না দিতে ও সীমান্তে কোন পশুর হাট না বসানোর নির্দশনা দিয়েছেন প্রাণিসম্পদমন্ত্রী।দেশি গরুর চাহিদা বাড়াতে এবার কোরবানির ঈদের আগে সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট-ইজারা না দিতে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ এ নির্দেশনা দেনকিন্তু তাঁর এ নির্দেশনা অমান্য করেই সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার ভারতের মেঘালয় পাহাড় সীমান্তবর্তী মহিষখলা গরুরহাটে ভারতীয় গরুর হাট বসিয়ে রমরমা ব্যবসা পরিচালনা করছেন ওই বাজারের ইজারাদার সিন্ডিকেট চক্র।জানা গেছে, মধ্যনগর উপজেলার মহিষখলা সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন চোরাই পথ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ করছে গরু-মহিষের চালান। আর এসব অবৈধ গরুর বৈধতা দিচ্ছেন মহিষখলা বাজারের গরুহাটের অসাধু ইজারাদাররা।উল্লেখ্য, প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ গত ৩ মে সচিবালয়ে তাঁর সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, সীমান্তে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে এবং দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা দেওয়া হবে না। এমনকি কোন হাটও বসবেনা । কিন্তু মধ্যনগর সীমান্তবর্তী মহিষখলা বাজার গরুহাটের অসাধু ইজারাদার সিন্ডিকেটরা মন্ত্রীর এ নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে তারা প্রকাশ্যেই ওই গরুহাটে শত-শত ভারতীয় গরু, মহিষসহ বিভিন্ন পশু বেচাকেনা করছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও রহস্যজনক কারনে নিরব ভূমিকা পালন করে আসছেন। উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলার মহিষখলা বাজারের গরুরহাটটি ইজারা দেওয়ার জন্য এক কোটি ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৮ টাকা বার্ষিক ইজারামূল্য নির্ধারণ করে পরপর পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরপত্রদাতা না পাওয়ায় উপজেলা প্রশাসন গত ৩ বৈশাখ থেকে অবশিষ্ট সময় ৩০ চৈত্র ১৪৩৩ বাংলা সন পর্যন্ত খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়।পরে সে মোতাবেক ৬১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে উক্ত মহিষখলা বাজার গরুরহাটটি খাস কালেকশনে ইজারা নেন বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন।এদিকে মহিষখলা বাজারটি ভারতের মেঘালয় পাহাড় সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় সহজেই এ বাজারে ভারত থেকে অবৈধ পথে আনা গরু, মহিষসহ বিভিন্ন পশুতে সয়লাব থাকে। আর এসব অবৈধ গরু ও মহিষকে বৈধতা দিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।এ কারণে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত ওই পশুর হাটটি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারিরাসহ কৃষকরা।অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধভাবে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরু-মহিষ এপারে আনা মাত্রই মহিষখলা বাজারের ইজারদারের লোকজন গরু প্রতি ১ হাজার টাকা ও প্রতিটি মহিষের জন্য ২ হাজার টাকা করে নিয়ে তারা ওইসব অবৈধ গবাদিপশুর ক্রয় বিক্রয়ের হাসিল রশিদ দিয়ে তার বৈধতা দিয়ে আসছেন। আর তাদের দেয়া এই কাগজের বলেই ভারতীয় গরু-মহিষ বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাট-বাজারগুলোতে।বিশেষ করে ওইসব অবৈধ গরু-মহিষের বড় মোকাম হলো পাশের নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার নৈহাটী বাজার গরুহাট ও ধর্মপাশা বাজার গরুরহাট। এরমধ্যে প্রতি বৃহস্পতিবার বসে ধর্মপাশা গরুহাট ও প্রতি সোমবারে বসে বারহাট্টার নৈহাটি বাজার গরু হাট। এ দুটি বাজারে কয়েক হাজার ভারতীয় গরু ও মহিষ কেনাবেচা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে।এদিকে সুনামগঞ্জের সাথে ভারতের সীমান্ত রয়েছে ১২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার অন্তত ৬টি সীমান্ত স্পটে এসব চোরাকারবারের সাথে স্থানীয় প্রায় পাঁচ শতাধিক চোরাকারবারি জড়িত রয়েছেন।এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য মতে, মধ্যনগর উপজেলার এসব স্পটগুলো হচ্ছে-বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের মহেষখলা, কাইটাকোনা, কড়ইবাড়ী (কড়ই চড়া), আমতলা, ঘিলাগড়া ও বাঙ্গালভিটা। এসব স্পট দিয়ে প্রতিদিন গরু-মহিষসহ ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে নিয়ে আসছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মহিষখলা বাজারের গবাদিপশুর হাটকে কেন্দ্র করেই মূলত এখানকার একটি চোরাকারবারি চক্র সক্রিয় রয়েছেন।গরু ও মহিষ চোরাকারবারের সাথে মহিষখলা বাজার ইজারাদার সিন্ডিকেটের লোকজন সরাসরি জড়িত বলেও জানান তারা।তারা আরও বলেন, মহিষখলা বাজারের ইজারদার সিন্ডিকেট সদস্যরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের নেতা। তাই এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সংবাদকর্মী বলেন, মহিষখলা বাজার গবাদিপশুর হাটের কোনো অনুমোদন নেই। তারপরও মহিষখলা বাজারের ইজারদাররা অবৈধ পথে আনা ভারতীয় গরু মহিষের হাসিল রশিদ দিয়ে বৈধতা দিচ্ছেন। তাদের একটি রশিদের মূল্য ১ থেকে দুই হাজার টাকা। এ ভাবে বছরে মহিষখলা গরুহাটের ইজারাদার সিন্ডিকেট ৫-৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহিষখলা বাজারের এক গরু ব্যবসায়ী বলেন, ভারত থেকে অবৈধ পথে আসা গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া না আসলে ওই বাজারটি বছরে ৫০ হাজার টাকায়ও কেউ ইজারা নিবেনা। তিনি আরো বলেন, ভারত থেকে আনা আমাদের কোনো গরু-মহিষকে মহিষখলা গরুহাটে নিতে হয়না। আমরা অবৈধ এসব পশু বাজারের আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে রাখি। পরে ইজাদারের লোকজনকে খবর দিলে তারা গ্রামে এসে গরু প্রতি ১ হাজার ও মহিষ প্রতি ২ হাজার টাকা আমাদের কাছ থেকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওইসব পশুর বৈধতার রশিদ দিয়ে যান এবং আমরাও গ্রামে রেখেই ওইসব পশু পাইকারদের কাছে বিক্রি করে আসছি। তবে আমরা যতটুকু জানি ওই টাকার ভাগ স্থানীয় আইনশৃংখলা বাহিনীকেও দেয়া হয় বলেই আমাদেরকে এ ব্যবসা করতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়না।এ বিষয়ে মহিষখলা বাজারের ইজারাদার ও বংশিকুন্ডা উওর ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতিমো. মোক্তার হোসেন বলেন, প্রতি মঙ্গলবার মহিষখলা বাজারের গরুর হাট বসে।আলাদা করে কোরবানির হাট বসে না।সীমান্তে পশুর হাট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা আছে বলে আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনও তাঁকে কিছু জানায়নি বলেও তিনি জানান।মধ্যনগর থানার ওসি একেএম সাহাবুদ্দিন শাহীনের ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল করলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও এ ব্যাপারে তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় ঘোষ বলেন, সীমান্তে পশুর হাট বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে।মহিষখলা পশুর হাট বন্ধ থাকবে। আগামী মঙ্গলবার যদি সেখানে গরুর হাট বসানো হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি’ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির বলেন, উর্ধ্বতন সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির আভিযানিক কার্যক্রম ও গোয়েন্দা তৎপরতা সর্বোতভাবে অব্যাহত রয়েছে।ছবি- প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য করে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এভাবেই মধ্যনগর উপজেলাধীন ভারতের মেঘালয় পাহাড় সীমান্তবর্তী মহিষখলা বাজার গরুরহাটে অবৈধ ভারতীয় গরুর হাট বসে। গত মঙ্গলবার মহিষখলা বাজারের দৃশ্য এটি।